ভারতীয় সভ্যতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে বহু প্রাচীন নিয়ম কেবল ইতিহাস হয়ে যায়নি, বরং আজও জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হচ্ছে। দেবমূর্তির চোখ শেষ মুহূর্তে আঁকার রীতি তার অন্যতম উদাহরণ। এটি কোনো লুপ্ত প্রথা নয়; এটি প্রাচীন ভারতের শাস্ত্রনির্দেশিত একটি নিয়ম, যা আজও একই অর্থ ও শ্রদ্ধা নিয়ে অনুসৃত হয়।
1. প্রাচীন ভারতের নিয়ম—মূর্তি মানেই জীবন্ত সত্তা
প্রাচীন ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রে মূর্তিকে কখনোই নিছক পাথর বা মাটি হিসেবে দেখা হয়নি। মূর্তিকে কল্পনা করা হয়েছে দেবতার দেহ হিসেবে, যেখানে চোখ হলো চেতনার প্রকাশ। তাই চোখ আঁকা মানে ছিল দেবতার জাগরণের মুহূর্ত—এই ধারণা তখন যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়ে গেছে।
2. ‘নেত্রোন্মীলন’—শাস্ত্রে নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তিত বিধান
শিল্পশাস্ত্র ও আগমগ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলা আছে—মূর্তি সম্পূর্ণ হওয়ার আগে চোখ দেওয়া যাবে না। এই নিয়ম আজও মন্দির নির্মাণ ও প্রতিমাশিল্পে অপরিবর্তিতভাবে মানা হয়। নাম বদলায়নি, অর্থ বদলায়নি—শুধু সময় বদলেছে।
3. দর্শনের ধারণা: তখন যেমন, এখনো তেমন
ভারতীয় দর্শনে ‘দর্শন’ শব্দটির অর্থ শুধু দেখা নয়। এখানে ভক্ত দেবতাকে দেখেন এবং দেবতাও ভক্তকে দেখেন—এই দ্বিমুখী সম্পর্কের সূচনা চোখ থেকেই। তাই চোখ আঁকার আগে দেবমূর্তিকে আজও ‘অজাগ্রত’ বলে ধরা হয়।
4. শিল্পীর ভূমিকা—প্রাচীন নিয়ম আজও বহাল
প্রাচীন ভারতে যেমন চোখ আঁকার দায়িত্ব থাকত প্রধান শিল্পীর ওপর, আজও তাই। বহু প্রতিমাশিল্পী এখনো উপবাস, শুদ্ধব্রত ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এই কাজ করেন। এটি তাঁদের কাছে নিছক পেশা নয়, বরং একধরনের সাধনা।
5. চোখ আঁকার সময় নির্দিষ্ট তিথি—আজও মানা হয়
শুভ তিথি ও নক্ষত্র দেখে চোখ আঁকার প্রথা প্রাচীন ভারতের নিয়ম। আজও দুর্গাপূজা, মন্দির প্রতিস্থাপন বা নতুন বিগ্রহ স্থাপনের সময় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। আধুনিক যুগেও এই সিদ্ধান্ত জ্যোতিষশাস্ত্র মেনেই নেওয়া হয়।
6. উগ্র দেবতার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা
কালী, ভৈরব বা নৃসিংহের মতো উগ্র দেবতার মূর্তিতে চোখ আঁকার সময় প্রাচীন নিয়ম আজও কঠোরভাবে মানা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই দেবতাদের দৃষ্টি অত্যন্ত শক্তিশালী—তাই কোনো নিয়ম ভঙ্গ করা অনুচিত।
7. আয়নায় চোখ আঁকার প্রথা—আজও জীবিত
কিছু অঞ্চলে আজও শিল্পীরা সরাসরি চোখ না এঁকে আয়নায় প্রতিফলন দেখে চোখ আঁকেন। এই রীতির উল্লেখ প্রাচীন গ্রন্থেও পাওয়া যায় এবং তা আজও পালিত হচ্ছে।
8. কেন এই রীতি বদলায়নি?
কারণ এটি কেবল একটি আচার নয়। এটি দর্শন, বিশ্বাস ও শিল্পচেতনার সমন্বয়। তাই আধুনিকতার চাপেও এই প্রাচীন নিয়ম আজও একই গভীরতা ও মর্যাদায় টিকে আছে।
দেবমূর্তির চোখ শেষ মুহূর্তে আঁকার রীতি প্রাচীন ভারতের একটি অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা। এটি অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। ভারতীয় সভ্যতার শক্তি এখানেই—যেখানে হাজার বছরের নিয়ম আজও জীবন্ত ও অর্থবহ।

No comments:
Post a Comment