Translate

Tuesday, February 3, 2026

ত্রিদেব: সৃষ্টি–স্থিতি–লয়—পুরাণে কেন তিন দেবতা?






হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হলো সৃষ্টি–স্থিতি–লয় (Creation–Preservation–Dissolution)।
এই তিনটি কাজকে প্রতিনিধিত্ব করে তিন দেবতা—ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব। তাদের একসঙ্গে পূজা বা আলোচনা মানে হলো বিশ্বের পরিপূর্ণ চক্র বোঝা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো:
কেন এই তিন দেবতা?
এরা কীভাবে একে অপরের থেকে আলাদা হলো?
এবং তাদের পৌরাণিক ইতিহাসের সূত্র কী?
এগুলোই এখানে আমরা দেখবো।

১) ব্রহ্মা: সৃষ্টি দেবতার ইতিহাস

ব্রহ্মা শব্দটির মূল অর্থ “বৃহৎ” বা “বর্ধিত”—এখানে বুঝানো হয়েছে “সৃষ্টি” বা “সৃষ্টি শক্তি”।
পুরাণে ব্রহ্মার জন্ম, গঠন ও কাজের নানা কাহিনি আছে, কিন্তু সবচেয়ে প্রচলিত হলো:
ব্রহ্মা সৃষ্টির মূল সত্তা—ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তির দায়িত্ব তাঁর হাতে।
তিনি “ব্রহ্মাণ্ডের জনক” বা “প্রজাপতি” হিসেবেও পরিচিত।
পুরাণে ব্রহ্মাকে প্রায়ই হিরণ্যগর্ভ/বদরাশন/অন্তর্বাস—এইসব কাহিনির সাথে যুক্ত করা হয়।
যেখানে “হিরণ্যগর্ভ” থেকে সৃষ্টির শুরু, অর্থাৎ বিশ্বের উৎপত্তি।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় হলো—
ব্রহ্মার পূজা অনেক কম।
এটা কারণ কেবল পুরাণেই নয়, ধর্মীয় ইতিহাসে ব্রহ্মাকে “সৃষ্টির পরেও তিনি নিষ্ক্রিয়” বা “সৃষ্টি সম্পন্ন করার পর তাঁর ভূমিকা কম”—এই ধারণা এসেছে।
কিছু পুরাণে ব্রহ্মাকে অন্য দেবতাদের চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এমনকি “ব্রহ্মা পূজার অযোগ্য” কথাও দেখা যায়।
এটাই প্রমাণ করে যে ত্রিদেব ধারণা একটি পরবর্তী পর্যায়ের ধর্মীয় গঠন—যেখানে “সৃষ্টি” একেবারে আলাদা দায়িত্ব হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু পূজার কেন্দ্রবিন্দুতে বেশি গুরুত্ব পায় স্থিতি ও লয়।


২) বিষ্ণু: স্থিতি/সংরক্ষণ দেবতার ইতিহাস

বিষ্ণু শব্দের মূল অর্থ “সর্বত্র বিস্তৃত”—অর্থাৎ “সবখানে উপস্থিত”।
বেদিক যুগে বিষ্ণুকে একটি দেবতা হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু তিনি ছিলেন বহু দেবতার মধ্যে একটি।
পুরাণে বিষ্ণুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো:
বিশ্বের রক্ষা ও সংরক্ষণ।
যখন পৃথিবীতে অশান্তি, অধর্ম, অন্যায় বাড়ে—তখন বিষ্ণু অবতার নিয়ে আসে।
এখানে “অবতার” ধারণা ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এটা প্রমাণ করে যে পুরাণে বিষ্ণুর ভূমিকা কেবল “এক দেবতা” নয়—এটা একটি দর্শনগত শক্তি।
অবতারকথা অনুযায়ী বিষ্ণু নানা যুগে পৃথিবীতে আসেন—
রাম,
কৃষ্ণ,
বুদ্ধ (কিছু পুরাণে),
কর্ম-ধর্ম রক্ষা করতে বিভিন্ন রূপে।
এখানে একটি ঐতিহাসিক দিক হলো—
অবতার ধারণা কেবল ধর্মীয় নয়, এটি সমাজের পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে জুড়ে।
যেমন:
বিভিন্ন যুগে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী “রক্ষা” এর রূপ বদলেছে—
আর সেই বদলেই পুরাণে বিভিন্ন অবতারকথা গড়ে উঠেছে।


৩) শিব: লয়/বিনাশের দেবতা—কিন্তু কেন ‘বিনাশ’?

শিবকে আমরা সাধারণত “বিনাশকারী” ভাবি, কিন্তু পুরাণের দার্শনিক ব্যাখ্যা হলো—
লয় মানে বিনাশ নয়, পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টি।
শিবের তান্ডব বা নৃত্য কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়।
এটি প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে “চক্র” বা “কালের চক্র” বোঝায়—যেখানে কোনো কিছু শেষ হলে নতুন কিছু শুরু হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি সমস্ত জগতের পরিবর্তনকে ন্যায়সঙ্গত করে।
পুরাণে শিবের অনেক নামই এই ধারণাকে তুলে ধরে—
মহেশ্বর (বড় ইশ্বর), শংকর (শুভ দানকারী), নিলকন্ঠ (বিষপানকারী) ইত্যাদি।
এগুলো দেখায় শিব শুধু ধ্বংসকারী নয়—তিনি সমগ্র জগতের “রূপান্তর”।
শৈব দর্শনে শিবের অবস্থান একেবারে কেন্দ্রীয়, কারণ তিনি কালের ঈশ্বর—যিনি সবকিছু শেষ করে আবার শুরু করেন।


৪) ত্রিদেব: একে অপরের সাথে সম্পর্ক

ত্রিদেব ধারণা হলো বিশ্বের তিনটি মূল কার্য:
সৃষ্টি (ব্রহ্মা)
স্থিতি (বিষ্ণু)
লয় (শিব)
এগুলো একে অপরের পরিপূরক।
কোনো একটি কাজ ছাড়া বিশ্ব-চক্র অসম্পূর্ণ।
তবে পুরাণে ত্রিদেবকে একসাথে দেখানো হলেও, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক কখনো কখনো সংঘাত-ভিত্তিক কাহিনিতেও দেখা যায়।
যেমন:
ব্রহ্মার সৃষ্টির ক্ষমতা
বিষ্ণুর সংরক্ষণ
শিবের লয়—
এই তিনের মধ্যে “কোনটা প্রধান?”—এই প্রশ্নই বিভিন্ন পুরাণে নাটকীয়ভাবে উঠে আসে।
এগুলো আসলে শাস্ত্র ও সমাজের মধ্যে ধারণার পরিবর্তনকে বোঝায়।
যেখানে এক যুগে বিষ্ণু প্রধান, অন্য যুগে শিব প্রধান, আবার কোথাও শাক্তি (দেবী) প্রধান—এই পরিবর্তন ধর্মের ইতিহাসের একটি বড় অংশ।



৫) মূর্তিশিল্পে ত্রিদেবের প্রকাশ

প্রাচীন মন্দির, গুহাচিত্র, ভাস্কর্যে ত্রিদেবের চিত্র পাওয়া যায়।
তবে প্রত্নতত্ত্বে দেখা যায়, প্রাথমিক যুগে একাধিক দেবতার সমবেত পূজা কম—
সর্বপ্রথম “বেদিক দেবতা”–রূপে অগ্নি, ইন্দ্র ইত্যাদি ছিল।
পরে পুরাণ যুগে ত্রিদেবের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এটি ধর্মের “রূপান্তর” ও “সংকেন্দ্রীকরণ” নির্দেশ করে।
একদিকে বেদিক যুগে বহু দেবতা, অন্যদিকে পুরাণ যুগে ত্রিদেব—এটা দেখায় কীভাবে ধর্মীয় চিন্তা এক ধাপে সংগঠিত হয়েছে।



ত্রিদেব ধারণা শুধু একটি ধর্মীয় ভাবনা নয়—এটা ভারতীয় দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক বৃহৎ চিত্র।
সৃষ্টি–স্থিতি–লয়ের তিনটি স্তর আমাদের দেখায়:
কিভাবে বিশ্ব সৃষ্টি হলো (ব্রহ্মা)
কিভাবে সংরক্ষণ হয় (বিষ্ণু)
এবং কিভাবে পরিবর্তন/লয় হয় (শিব)
এরা তিনজন আলাদা দেবতা, কিন্তু একই চক্রের অংশ—যা সমস্ত জগতকে একত্রে পরিচালিত করে।

Friday, January 16, 2026

দেবমূর্তির চোখ শেষ মুহূর্তে আঁকার প্রচলন কেন? এর পিছনে কি কারণ?






ভারতীয় সভ্যতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে বহু প্রাচীন নিয়ম কেবল ইতিহাস হয়ে যায়নি, বরং আজও জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হচ্ছে। দেবমূর্তির চোখ শেষ মুহূর্তে আঁকার রীতি তার অন্যতম উদাহরণ। এটি কোনো লুপ্ত প্রথা নয়; এটি প্রাচীন ভারতের শাস্ত্রনির্দেশিত একটি নিয়ম, যা আজও একই অর্থ ও শ্রদ্ধা নিয়ে অনুসৃত হয়।

1. প্রাচীন ভারতের নিয়ম—মূর্তি মানেই জীবন্ত সত্তা

প্রাচীন ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রে মূর্তিকে কখনোই নিছক পাথর বা মাটি হিসেবে দেখা হয়নি। মূর্তিকে কল্পনা করা হয়েছে দেবতার দেহ হিসেবে, যেখানে চোখ হলো চেতনার প্রকাশ। তাই চোখ আঁকা মানে ছিল দেবতার জাগরণের মুহূর্ত—এই ধারণা তখন যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়ে গেছে।

2. ‘নেত্রোন্মীলন’—শাস্ত্রে নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তিত বিধান

শিল্পশাস্ত্র ও আগমগ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলা আছে—মূর্তি সম্পূর্ণ হওয়ার আগে চোখ দেওয়া যাবে না। এই নিয়ম আজও মন্দির নির্মাণ ও প্রতিমাশিল্পে অপরিবর্তিতভাবে মানা হয়। নাম বদলায়নি, অর্থ বদলায়নি—শুধু সময় বদলেছে।

3. দর্শনের ধারণা: তখন যেমন, এখনো তেমন

ভারতীয় দর্শনে ‘দর্শন’ শব্দটির অর্থ শুধু দেখা নয়। এখানে ভক্ত দেবতাকে দেখেন এবং দেবতাও ভক্তকে দেখেন—এই দ্বিমুখী সম্পর্কের সূচনা চোখ থেকেই। তাই চোখ আঁকার আগে দেবমূর্তিকে আজও ‘অজাগ্রত’ বলে ধরা হয়।

4. শিল্পীর ভূমিকা—প্রাচীন নিয়ম আজও বহাল

প্রাচীন ভারতে যেমন চোখ আঁকার দায়িত্ব থাকত প্রধান শিল্পীর ওপর, আজও তাই। বহু প্রতিমাশিল্পী এখনো উপবাস, শুদ্ধব্রত ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এই কাজ করেন। এটি তাঁদের কাছে নিছক পেশা নয়, বরং একধরনের সাধনা।

5. চোখ আঁকার সময় নির্দিষ্ট তিথি—আজও মানা হয়

শুভ তিথি ও নক্ষত্র দেখে চোখ আঁকার প্রথা প্রাচীন ভারতের নিয়ম। আজও দুর্গাপূজা, মন্দির প্রতিস্থাপন বা নতুন বিগ্রহ স্থাপনের সময় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। আধুনিক যুগেও এই সিদ্ধান্ত জ্যোতিষশাস্ত্র মেনেই নেওয়া হয়।

6. উগ্র দেবতার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

কালী, ভৈরব বা নৃসিংহের মতো উগ্র দেবতার মূর্তিতে চোখ আঁকার সময় প্রাচীন নিয়ম আজও কঠোরভাবে মানা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই দেবতাদের দৃষ্টি অত্যন্ত শক্তিশালী—তাই কোনো নিয়ম ভঙ্গ করা অনুচিত।

7. আয়নায় চোখ আঁকার প্রথা—আজও জীবিত

কিছু অঞ্চলে আজও শিল্পীরা সরাসরি চোখ না এঁকে আয়নায় প্রতিফলন দেখে চোখ আঁকেন। এই রীতির উল্লেখ প্রাচীন গ্রন্থেও পাওয়া যায় এবং তা আজও পালিত হচ্ছে।

8. কেন এই রীতি বদলায়নি?

কারণ এটি কেবল একটি আচার নয়। এটি দর্শন, বিশ্বাস ও শিল্পচেতনার সমন্বয়। তাই আধুনিকতার চাপেও এই প্রাচীন নিয়ম আজও একই গভীরতা ও মর্যাদায় টিকে আছে।


দেবমূর্তির চোখ শেষ মুহূর্তে আঁকার রীতি প্রাচীন ভারতের একটি অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা। এটি অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। ভারতীয় সভ্যতার শক্তি এখানেই—যেখানে হাজার বছরের নিয়ম আজও জীবন্ত ও অর্থবহ।

Featured Posts

ত্রিদেব: সৃষ্টি–স্থিতি–লয়—পুরাণে কেন তিন দেবতা?

হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হলো সৃষ্টি–স্থিতি–লয় (Creation–Preservation–Dissolution)। এই তিনটি কাজকে প্রতিনিধিত্...

Popular Posts