আমরা প্রতিদিন খুব সহজে বলি— “আমি এটা চাই”, “আমার এটা দরকার”, “আমি এমন একজন”।
কিন্তু ভারতীয় চিন্তাধারায় এই ‘আমি’ ধারণাটাকেই সবচেয়ে আগে প্রশ্ন করা হয়েছে। এখানে ‘আমি’কে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া হয়নি; বরং বলা হয়েছে—এই ‘আমি’ আসলে কী?
এই প্রশ্ন শুধু প্রাচীন দর্শনের বিষয় ছিল না, আজকের মানসিক অস্থিরতা, পরিচয় সংকট এবং আত্মবিশ্বাসের সমস্যার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক আছে।
‘আমি’ মানে কী—শরীর, মন না পরিচয়?
ভারতীয় ভাবনায় বলা হয়—
শরীর বদলায়
মন বদলায়
চিন্তা, আবেগ, অভ্যাস বদলায়
তাহলে যেটা সব সময় বদলাচ্ছে, সেটাকে কীভাবে স্থায়ী ‘আমি’ বলা যায়?
এই কারণেই ভারতীয় দর্শনে প্রশ্ন ওঠে—
“যা বদলাচ্ছে, সেটাই কি আমি?”
এই প্রশ্ন মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নয়, বরং অতিরিক্ত আত্মপরিচয়ের চাপ থেকে মুক্ত করার জন্য।
আধুনিক জীবনে ‘আমি’ কেন এত ভারী হয়ে উঠেছে
আজকের দিনে ‘আমি’ বলতে আমরা বুঝি—
আমার চাকরি
আমার সাফল্য
আমার ব্যর্থতা
আমার পরিচয়
এই সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলায়, যখন এগুলোর কোনোটা নড়ে যায়, তখন পুরো মানুষটাই ভেঙে পড়ে।
চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশার বড় কারণ এখানেই।
ভারতীয় চিন্তা বলে—
সমস্যা জীবনে নয়, ‘আমি’কে খুব শক্ত করে ধরে রাখায়।
‘আমি’ প্রশ্ন করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা নয়
এটা অনেকেই ভুল বোঝে।
‘আমি’ প্রশ্ন করা মানে নিজেকে ছোট করা বা দায়িত্ব এড়ানো নয়। বরং—
কাজ থাকবে
দায়িত্ব থাকবে
সিদ্ধান্ত থাকবে
কিন্তু সব কিছুর ভার ‘আমি’ নামের একটিমাত্র পরিচয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
এতে মানুষ ভিতরে হালকা হয়, সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হয়।
এই ধারণা আজও কেন এত প্রাসঙ্গিক
আজ মানুষ বলছে—
“আমি কে, বুঝতে পারছি না”
“নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি”
এই অনুভূতিগুলো নতুন নয়। ভারতীয় চিন্তা বহু আগেই বলেছিল—
নিজেকে হারানোর ভয় তখনই আসে, যখন আমরা মনে করি নিজেকে একটা নির্দিষ্ট রূপে আটকে রাখতে হবে।
ভারতীয় ভাবনায় ‘আমি’ কমলে কী বাড়ে
গ্রহণযোগ্যতা
মানসিক স্থিরতা
কম তুলনা
কম অহংকার
কম ভয়
এই কারণেই এখানে আত্মজ্ঞানকে ক্ষমতা বলা হয়েছে, দুর্বলতা নয়।
ভারতীয় চিন্তায় ‘আমি’কে প্রশ্ন করা মানে জীবনকে জটিল করা নয়, বরং জীবনের অপ্রয়োজনীয় বোঝা নামিয়ে রাখা।
আজকের দ্রুত, তুলনামূলক ও পরিচয়-কেন্দ্রিক জীবনে এই ভাবনাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজনীয়।
কারণ শান্তি আসে তখনই,
যখন মানুষ বুঝতে শেখে—
সে শুধু তার ‘আমি’ নয়।
