ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে শৈব ধর্ম একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এই ধর্মের কেন্দ্রীয় উপাস্য দেবতা শিব এবং তাঁর প্রতীক হিসেবে পূজিত হয় শিবলিঙ্গ। লিঙ্গ পূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি সৃষ্টিতত্ত্ব, শক্তি ও চেতনার গভীর দার্শনিক প্রতীক। কিন্তু এই লিঙ্গ পূজার উৎপত্তি কোথায়? কীভাবে এটি শৈব ধর্মের মূল ভিত্তি হয়ে উঠল? এই লেখায় সেই ইতিহাস ও বিস্তারের কাহিনি তুলে ধরা হলো।
লিঙ্গ পূজার প্রাচীন উৎপত্তি
লিঙ্গ পূজার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রাগৈতিহাসিক ও বৈদিক-পূর্ব যুগে। সিন্ধু সভ্যতার (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০০ বছর) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এমন কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেগুলোকে অনেক গবেষক শিবলিঙ্গ বা শিব-সংক্রান্ত প্রতীকের সাথে যুক্ত করেন।
লিঙ্গ শব্দের অর্থ “চিহ্ন” বা “প্রতীক”। এখানে লিঙ্গকে কেবল শারীরিক প্রতীক হিসেবে না দেখে সৃষ্টিশক্তির বিমূর্ত রূপ হিসেবে বোঝা হয়। এটি পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন, শক্তি ও চেতনার সমন্বয়ের প্রতীক।
বৈদিক যুগে শিব ও লিঙ্গ ধারণা
ঋগ্বেদে শিবের সরাসরি উল্লেখ কম থাকলেও “রুদ্র” নামক দেবতাকে শিবের প্রাথমিক রূপ হিসেবে ধরা হয়। রুদ্র ছিলেন ধ্বংস ও আরোগ্যের দেবতা—যিনি ভয়ংকর আবার কল্যাণকারীও।
পরবর্তীকালে উপনিষদ ও পুরাণে শিব পূর্ণ রূপ লাভ করেন এবং লিঙ্গ শিবের নিরাকার রূপের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ঈশ্বরকে কোনো মানবাকৃতিতে সীমাবদ্ধ না করে এক অনন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
পুরাণে লিঙ্গ পূজার ব্যাখ্যা
শিব পুরাণ ও লিঙ্গ পুরাণে লিঙ্গ পূজার বিস্তৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একটি বিখ্যাত কাহিনি অনুযায়ী—
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক চলাকালে শিব এক অগ্নিস্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হন। সেই স্তম্ভের শুরু বা শেষ কেউ খুঁজে পায়নি। এই অনন্ত স্তম্ভই পরে শিবলিঙ্গ হিসেবে পূজিত হতে থাকে।
এই কাহিনি লিঙ্গকে অনন্ত, অসীম ও সর্বব্যাপী শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
শৈব ধর্মের বিস্তার
খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে শৈব ধর্ম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
দক্ষিণ ভারতে নায়নার সাধকরা শিবভক্তিকে জনপ্রিয় করেন
কাশ্মীর শৈব দর্শনে শিবকে সর্বোচ্চ চেতনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়
মধ্যযুগে রাজা ও সাধারণ মানুষ উভয়ের মধ্যেই শিব পূজা বিস্তৃত হয়
গ্রামীন সমাজে শিব হয়ে ওঠেন লোকদেবতা, যিনি রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
লিঙ্গ পূজার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
লিঙ্গ পূজাকে অনেক সময় ভুলভাবে শুধুমাত্র যৌন প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে এটি—
সৃষ্টি ও ধ্বংসের চক্রের প্রতীক
পুরুষ ও প্রকৃতির ঐক্য
নিরাকার ঈশ্বর উপলব্ধির মাধ্যম
গ্রামীন সমাজে এই পূজা মানুষকে প্রকৃতি, জীবন ও মৃত্যুর সাথে সংযুক্ত করে।
লিঙ্গ পূজা ও শৈব ধর্ম কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং ভারতীয় সভ্যতার গভীর দার্শনিক ও সামাজিক চেতনার প্রতিফলন। হাজার হাজার বছর ধরে এই বিশ্বাস মানুষের জীবনে আশ্রয়, শক্তি ও আত্মোপলব্ধির পথ দেখিয়ে চলেছে।
%20(2).jpeg)